ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস (কোভিড ১৯) | | সেরা নিউজ ২৪ ডটকম | SeraNews24.Com | সর্বদা সত্যের সন্ধানে
বিজ্ঞপ্তিঃ

দেশের জনপ্রিয় জাতীয় অনলাইন দৈনিক “সেরা নিউজ ২৪ ডটকম” এর সংবাদ সংগ্রহ করার জন্য জেলা-উপজেলা পর্যায়ে কর্মঠ, সৎ, সাহসী পুরুষ ও মহিলা সংবাদদাতা/প্রতিনিধি/বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগ চলছে। যোগাযোগঃ 01727747903 ইমেইলঃ [email protected]

রায়পুরে অগ্নিকান্ডে ৬টি দোকান পুড়ে ছাঁই সীমিত আকারে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার নির্দেশনা আত্রাই রাণীনগরে এসএসসি পরীক্ষায় কৃতকার্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন-ইসরাফিল আলম এমপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন চেয়ারম্যান শফিক লক্ষ্মীপুরে ইঞ্জিনিয়ারের উপর সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার হামলা মুন্সীগঞ্জে উপজেলা চেয়ারম্যানের বাড়িতে ডাকাতি জিয়াউর রহমানের ৩৯ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ টঙ্গীবাড়ির জমি সংক্রান্ত জেরে প্রতিপক্ষের হামলায় ৪জন আহত করোনা মোকাবিলায় নিরলসভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে মুন্সীগঞ্জ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী টঙ্গিবাড়ী উপজেলা ছাত্রদলের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পালন
ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস (কোভিড ১৯)

ইসলামের দৃষ্টিতে করোনা ভাইরাস (কোভিড ১৯)

ইতিহাস
হিজরি ৬৯ বর্ষ।
খ্রিষ্টীয় ৬৮৮ শতাব্দী।
মুসলিম বিশ্বে যখন উমাইয়া শাসনামল চলছিল। তখন মক্কা-মদিনায় ছিল আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা.-এর নিয়ন্ত্রনে। মক্কা-মদিনার শাসনকে কেন্দ্র করে বনু উমাইয়া আর আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর রা.-এর মধ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল তুঙ্গে, তখন বসরায় দেখা দেয় মহামারি!।ইতিহাসে এই মহামারিকে তাউনে জারিফ বলা হয়। আধুনিক পরিভাষায় বলতে হলে জারিফ ভাইরাস বলতে হয়।

জারিফ শব্দটি আরবি থেকে এসেছে।
যার অর্থ নিষ্কাশনকারী।
বানের পানি যেভাবে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, তদ্রুপ এই মহামারিও সব মানুষকে নিয়ে গিয়েছিল। এত বেশি মানুষ এই মহামারিতে মারা যায় যে, মহামারির নাম জারিফ হয়ে যায়। এই মহামারি স্থায়ী ছিল চারদিন।
√** প্রথমদিনেই মারা যায় ৭০ হাজার লোক!!!
√** দ্বিতীয়দিন মারা যায় ৭১ হাজার লোক!!!
√** তৃতীয়দিন মারা যায় ৭৩ হাজার লোক!!!আর
√** চতুর্থদিন তো হাতেগুনা লোক ছাড়া বাকি সবাই মারা যায়!!!

এই মহামারিতে যারা মারা যান, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন প্রসিদ্ধ নাহুশাস্ত্রবীদ ইমাম আবুল আসওয়াদ দুঈলি। এমনকী এই মহামারিতে মারা যান স্বয়ং বসরার গভর্নর ইবনে মামরের মাতা। তার লাশ কাফন-দাফন করার জন্য কোনো মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়নি। শেষ পর্যন্ত চারজন ভাড়াটে লোককে এনে কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।

তারিক বিন শিহাব বাজালি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ তাবেয়ি। গণবিধ্বংসী এই মহামারির সময়ে কয়েকজন লোকসহ তিনি হজরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর কাছে আসেন। আলাপচারিতা করার জন্য। আবু মুসা বাড়িতেই ছিলেন। তিনি তখন কুফার গভর্নর। তারিক বিন শিহাব বাজালি তার সঙ্গীদের নিয়ে যখন বসতে গেলেন, তখন আবু মুসা আশআরি শশব্যস্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আপনারা নগ্নপায়ে হাঁটবেন না। এ ঘরে একজন লোক মহামারিতে আক্রান্ত। মহামারির প্রাদুর্ভাব শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই গ্রাম থেকে বেরিয়ে, আপনারা আপনাদের প্রশস্ত শহরের মুক্ত বাতাসে গিয়ে শ্বাস নিতে পারেন।’

খুব খেয়াল করলে দেখবেন, আজ থেকে হাজার বছর পূর্বে, করোনার মতো জারিফ নামক গণবিধ্বংশী ভাইরাসের প্রতিরোধে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একজন সাহাবি হজরত আবু মুসা আশআরি রা. কতটা সচেতন ছিলেন! তার ঘরে আগত মেহমানদেরকেও সতর্ক করেছিলেন। নগ্নপদে ঘরে হাঁটতে নিষেধ করেছিলেন। এমনকী তাদেরকে ভাইরাসাক্রান্ত গ্রাম থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের শহরের মুক্ত বাতাসের অবগাহন করার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

ইসলামে ছোঁয়াচে রোগ বলতে কিছু নেই–তা ঠিক। কিন্তু পরোক্ষ্য ভাবে এটা কে না বলার সুযোগ নেই।রাসূল(স) মহামারী দেখা দিলে ভিতর ও বাইরের লোককে বাইরে ও প্রবেশ করতে নিষেধ করতেন না।তাই বলে সতর্কতা ও সচেতনতা অবলম্বন করা যাবে না–এমন নয়। আপনাকে যথাসম্ভব সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। হজরত আবু মুসা আশআরি রা.-এর কথা থেকে আমরা এমনই শিক্ষা পাই। তাই আসুন, দুআ ও ইস্তিগফারের পাশাপাশি সব ধরনের সতর্কতা অবলম্বন করি।

*আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৮/২১২, ইমাম ইবনে কাসির।
*তারিখুল ইসলাম ৩/১২৯, ইমাম শামসুদ্দিন জাহাবি।
*তারুখুল মুলুক ওয়াল উমাম ৫/১২, ইমাম তাবারি।

সাহাবীদের সময়ে একবার মহামারি প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেই প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শাহাদাতবরণ করেন অনেক সাহাবী। তার মধ্যে একজন ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী।
..
৬৩৯ খ্রিস্টাব্দ। তখন খলিফা ছিলেন উমর ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। প্লেগ দেখা দিয়েছিলো সিরিয়ায়-প্যালেস্টাইনে। ইতিহাসে যা ‘আম্মাউস প্লেগ’ নামে পরিচিত। উমর (রাঃ) সিরিয়ার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছিলেন। ‘সারগ’ নামক জায়গায় পৌছার পর সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) খলিফাকে জানালেন, সিরিয়ায় তো প্লেগ দেখা দিয়েছে।
..
উমর (রাঃ) প্রবীণ সাহাবীদেরকে পরামর্শের জন্য ডাকলেন। এখন কী করবো? সিরিয়ায় যাবো নাকি যাবো না? সাহাবীদের মধ্য থেকে দুটো মত আসলো। একদল বললেন, “আপনি যে উদ্দেশ্যে বের হয়েছেন, সে উদ্দেশ্যে যান”। আরেকদল বললেন, “আপনার না যাওয়া উচিত”।
..
তারপর আনসার এবং মুহাজিরদের ডাকলেন পরামর্শ দেবার জন্য। তারাও মতপার্থক্য করলেন। সবশেষে বয়স্ক কুরাইশদের ডাকলেন। তারা এবার মতানৈক্য করলেন না। সবাই মত দিলেন- “আপনার প্রত্যাবর্তন করা উচিত। আপনার সঙ্গীদের প্লেগের দিকে ঠেলে দিবেন না।”
..
উমর (রাঃ) তাঁদের মত গ্রহণ করলেন। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মদীনায় ফিরে যাবেন। খলিফাকে মদীনায় ফিরে যেতে দেখে সেনাপতি আবু উবাইদাহ (রাঃ) বললেন, “আপনি কি আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীর থেকে পালানোর জন্য ফিরে যাচ্ছেন?”
..
আবু উবাইদাহর (রাঃ) কথা শুনে উমর (রাঃ) কষ্ট পেলেন। আবু উবাইদাহ (রাঃ) ছিলেন তাঁর এতো পছন্দের যে, আবু উবাইদাহ (রাঃ) এমন কথা বলতে পারেন উমর (রাঃ) সেটা ভাবেননি।
উমর (রাঃ) বললেন, “ও আবু উবাইদাহ! যদি তুমি ব্যতীত অন্য কেউ কথাটি বলতো! আর হ্যাঁ, আমরা আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাচ্ছি।”
..
আল্লাহর এক তাকদীর থেকে আরেক তাকদীরের দিকে ফিরে যাওয়ার মানে কী? উমর (রাঃ) সেটা আবু উবাইদাহকে (রাঃ) বুঝিয়ে বলেন, “তুমি বলতো, তোমার কিছু উটকে তুমি এমন কোনো উপত্যকায় নিয়ে গেলে যেখানে দুটো মাঠ আছে। মাঠ দুটোর মধ্যে একটি মাঠ সবুজ শ্যামল, আরেক মাঠ শুষ্ক ও ধূসর। এবার বলো, ব্যাপারটি কি এমন নয় যে, তুমি সবুজ মাঠে উট চরাও তাহলে তা আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছো। আর যদি শুষ্ক মাঠে চরাও, তা-ও আল্লাহর তাকদীর অনুযায়ী চরিয়েছো।”
..
অর্থাৎ, উমর (রাঃ) বলতে চাচ্ছেন, হাতে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ভালোটা গ্রহণ করা মানে এই না যে আল্লাহর তাকদীর থেকে পালিয়ে যাওয়া।

কিছুক্ষণ পর আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আসলেন। তিনি এতক্ষণ অনুপস্থিত ছিলেন। তিনি এসে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি হাদীস শুনালেন।
“তোমরা যখন কোনো এলাকায় প্লেগের বিস্তারের কথা শুনো, তখন সেখানে প্রবেশ করো না। আর যদি কোনো এলাকায় এর প্রাদুর্ভাব নেমে আসে, আর তোমরা সেখানে থাকো, তাহলে সেখান থেকে বেরিয়ে যেও না।” [সহীহ বুখারীঃ ৫৭২৯]
রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীসটি সমস্যার সমাধান কর
আবু উবাইদাহ (রাঃ) ছিলেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী। আশারায়ে মুবাশশারার একজন। রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকালের পর খলিফা নির্বাচনের প্রসঙ্গ উঠলে আবু বকর (রাদিয়াল্লাহু আনহু) আবু উবাইদাহকে (রাঃ) প্রস্তাব করেন। উমর (রাঃ) ইন্তেকালের আগে কে পরবর্তী খলিফা হবেন এই প্রশ্ন উঠলে তিনি বলেন, “যদি আবু উবাইদাহ বেঁচে থাকতেন, তাহলে কোনো কিছু না ভেবে তাঁকেই খলিফা বানাতাম।”

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্লেগ সম্পর্কে বলেন, “এটা হচ্ছে একটা আজাব। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাদের উপর ইচ্ছা তাদের উপর তা প্রেরণ করেন। তবে, আল্লাহ মুমিনদের জন্য তা রহমতস্বরূপ করে দিয়েছেন। কোনো ব্যক্তি যদি প্লেগে আক্রান্ত জায়গায় সওয়াবের আশায় ধৈর্য ধরে অবস্থান করে এবং তার অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস থাকে যে, আল্লাহ তাকদীরে যা লিখে রেখেছেন তাই হবে, তাহলে সে একজন শহীদের সওয়াব পাবে।” [সহীহ বুখারীঃ ৩৪৭৪]

আবু উবাইদাহর (রাঃ) ইন্তেকালের পর সেনাপতি হন রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরেক প্রিয় সাহাবী মু’আজ ইবনে জাবাল (রাদিয়াল্লাহু আনহু)। সবাই তখন প্লেগের আতঙ্কে ভীত-সন্ত্রস্ত। নতুন সেনাপতি হবার পর মু’আজ (রাঃ) একটা ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেনঃ
“এই প্লেগ আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো মুসিবত নয় বরং তাঁর রহমত এবং নবীর দু’আ। হে আল্লাহ! এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও এর যথেষ্ট অংশ দান করুন।” [হায়াতুস সাহাবাঃ ২/৫৮২]

দু’আ শেষে এসে দেখলেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয়পুত্র আব্দুর রহমান প্লেগাক্রান্ত হয়ে গেছেন। ছেলে বাবাকে সান্ত্বনা দিয়ে কুর’আনের ভাষায় বলেনঃ “আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকুনান্না মিনাল মুমতারিন- সত্য তোমার রবের পক্ষ থেকে। সুতরাং, তুমি কখনো সন্দেহ পোষণকারীর অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” [সূরা বাকারাঃ ২:১৪৭]
পুত্রের সান্ত্বনার জবাব পিতাও দেন কুর’আনের ভাষায়ঃ “সাতাজিদুনী ইন শা আল্লাহু মিনাস সাবিরীন- ইন শা আল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবে।” [সূরা আস-সাফফাতঃ ৩৭:১০২]

কিছুদিনের মধ্যে তাঁর প্রিয়পত্র প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন, তাঁর দুই স্ত্রী শহীদ হন। অবশেষে তাঁর হাতের একটা আঙ্গুলে ফোঁড়া বের হয়। এটা দেখে মু’আজ (রাঃ) প্রচন্দ খুশি হন। আনন্দে বলেন, “দুনিয়ার সকল সম্পদ এর তুলনায় মূল্যহীন।” অল্পদিনের মধ্যে তিনিও প্লেগে আক্রান্ত হয়ে শহীদ হন। [আসহাবে রাসূলের জীবনকথা, ৩/১৫১-১৫২]

দুই.
করোনা ভাইরাস অনেক জায়গায় মহামারি আকার ধারণ করেছে। সারাবিশ্বে এখন আলোচিত টপিক হলো করোনা ভাইরাস। চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এর থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে ব্যস্ত। বিভিন্ন দেশের বিমানবন্দর, স্টেশনগুলোতে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কা’বা ঘরের তাওয়াফ সাময়িক স্থগিত রাখা হয়েছে (এখন খুলে দেওয়া হয়েছে)। সবমিলিয়ে পুরো বিশ্ব একটা আতঙ্কের মধ্যে আছে।
ঠিক এই মুহূর্তে প্রশ্ন উঠছে- করোনা ভাইরাস কি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আজাব?
বিগত কয়েক মাসের চীন সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাব এবং মুসলিমদের উপর নির্যাতনের ফলে অনেকেই মনে করছেন, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব। চীন সরকার উইঘুরের মুসলিমদের যেমনভাবে নির্যাতন করেছে, মুসলিম আইডেন্টিটির জন্য তাদেরকে যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে, চীন সরকারের এই ‘অ্যাকশন’ এর জন্য একটা ‘রিঅ্যাকশনারি’ অবস্থান থেকে মুসলিমরা কেউ কেউ করোনা ভাইরাসকে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব বলে অভিহিত করছেন।
রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস থেকে দেখতে পাই, প্লেগকে তিনি বলেছেন আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব, আবার বলেছেন এটা মুমিনদের জন্য শর্তসাপেক্ষে রহমত। একই মহামারি ভাইরাস কারো জন্য হতে পারে আজাব, আবার কারো জন্য হতে পারে রহমত। তাই বলে, একে ঢালাওভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব কিংবা ঢালাওভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত বলার সুযোগ নেই।
মহামারি ভাইরাস যদি আল্লাহর পক্ষ থেকে আজাব হয়ে থাকে, তাহলে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবী আল্লাহর আজাবে ইন্তেকাল করেছেন? সাহাবীদের বেলায় আল্লাহ সাধারণভাবে ঘোষণা করেছেন- আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও আল্লাহর প্রতি। তাহলে সুহাইল ইবনে আমর, মু’আজ ইবনে জাবাল, ফদল ইবনে আব্বাস, ইয়াজিদ ইবনে আবি সুফিয়ান, আবু মালিক আশ’আরী (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) সাহাবীগণ আল্লাহর আজাবে নিপতিত হয়েছেন?
উত্তর হচ্ছে- না। রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাদীস অনুযায়ী ঐ মহামারিকে তারা রহমত হিশেবে নিয়েছিলেন। মহামারিতে মৃত্যুবরণ করাকে তারা শাহাদাত হিশেবে দেখেছেন। যার ফলে মু’আজ ইননে জাবাল (রাঃ) সেই রহমত পাবার জন্য দু’আ পর্যন্ত করেন।

তিন.
মহামারি থেকে বাঁচার জন্য আমরা আল্লাহর কাছে দু’আ করবো, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী চলবো। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্লেগের ব্যাপারে প্রথমে সতর্ক করেন- যেসব জায়গায় প্লেগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে, সেসব জায়গায় যাবে না। তারপর বলেছেন, যেখানে আছো সেখানে প্লেগ দেখা দিলে অন্যত্র যাবে না।
মহান আল্লাহ তায়ালার আযাব এবং গজব সংক্রান্ত আয়াত সমুহ। আয়াতগুলো পড়ে মনে হচ্ছে,যেন নাজিল হলো মাত্র! পড়ে দেখুন এবং জেনে নিন করোনা কেন এসেছে–

-★সূরা আহযাব-৯
اِذۡ جَآءَتۡكُمۡ جُنُوۡدٌ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَيۡهِمۡ رِيۡحًا وَّجُنُوۡدً لَّمۡ تَرَوۡهَا‌ؕ )ا‌ۚ‏
আর তারপর আমি তোমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছিলাম এক ঝঞ্ঝা বায়ু এবং এক বাহিনী । এমন এক বাহিনী যা তোমরা চোখে দেখতে পাওনি ।

-সূরা আন‌আম-৪২
فَاَخَذۡنٰهُمۡ بِالۡبَاۡسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمۡ يَتَضَرَّعُوۡنَ﴾
– তারপর আমি তাদের উপর রোগব্যাধি, অভাব, দারিদ্র্য, ক্ষুধা চাপিয়ে দিয়ে ছিলাম, যেন তারা আমার কাছে নম্রতাসহ নতি স্বীকার করে ।

★সূরা ইয়াসীন-২৮-২৯
﴿ وَمَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلٰى قَوۡمِهٖ مِنۡۢ بَعۡدِهٖ مِنۡ جُنۡدٍ مِّنَ السَّمَآءِ وَمَا كُنَّا مُنۡزِلِيۡنَ﴾(اِنۡ كَانَتۡ اِلَّا صَيۡحَةً وَّاحِدَةً فَاِذَا هُمۡ خٰمِدُوۡنَ‏)
তারপর ( তাদের এই অবিচার মূলক জুলুম কার্জ করার পর ) তাদের বিরুদ্ধে আমি আকাশ থেকে কোনো সেনাদল পাঠাইনি । পাঠানোর কোনো প্রয়োজন‌ও আমার ছিল না । শুধু একটা বিস্ফোরণের শব্দ হলো, আর সহসা তারা সব নিস্তব্ধ হয়ে গেল ( মৃত লাশ হয়ে গেল )

★সূরা আ’রাফ-১৩৩
﴿ فَاَرۡسَلۡنَا عَلَيۡهِمُ الطُّوۡفَانَ وَالۡجَرَادَ وَالۡقُمَّلَ وَالضَّفَادِعَ وَالدَّمَ اٰيٰتٍ
مُّفَصَّلٰتٍ فَاسۡتَكۡبَرُوۡا وَكَانُوۡا قَوۡمًا مُّجۡرِمِيۡنَ‏﴾

অবশেষে আমি তাদের ওপর দুর্যোগ পাঠালাম,পংগপাল ছেড়ে দিলাম, উকুন ছড়িয়ে দিলাম, ব্যাঙের উপদ্রব সৃষ্টি করলাম এবং রক্ত বর্ষণ করলাম। এসব নিদর্শন আলাদা আলাদা করে দেখালাম। কিন্তু তারা অহংকারে মেতে রইলো এবং তারা ছিল বড়ই অপরাধ প্রবণ সম্প্রদায়।

★সূরা বাকারা-২৬
اِنَّ اللّٰهَ لَا يَسۡتَحۡىٖۤ اَنۡ يَّضۡرِبَ مَثَلاً مَّا ‌بَعُوۡضَةً فَمَا فَوۡقَهَا‌ؕ

নিশ্চয়ই আল্লাহ্ মশা কিংবা এর চাইতেও তুচ্ছ বিষয় ( ভাইরাস বা জীবাণু ) দিয়ে উদাহরণ বা তাঁর নিদর্শন প্রকাশ করতে লজ্জাবোধ করেন না ।

-সূরা আ’রাফ-৯৪
وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا فِىۡ قَرۡيَةٍ مِّنۡ نَّبِىٍّ اِلَّاۤ اَخَذۡنَاۤ اَهۡلَهَا بِالۡبَاۡسَآءِ وَالضَّرَّآءِ لَعَلَّهُمۡ يَضَّرَّعُوۡنَ
ওর অধিবাসীদেরকে আমি দূঃখ, দারিদ্র্য রোগ-ব্যধি এবং অভাব-অনটন দ্বারা আক্রান্ত করে থাকি । উদ্দেশ্য হলো তারা যেন, নম্র এবং বিনয়ী হয় ।

★সূরা মুদ্দাসসির-৩১
وَمَا يَعۡلَمُ جُنُوۡدَ رَبِّكَ اِلَّا هُوَ‌ؕ

তোমার “রবের” সেনাদল বা সেনাবাহিনী ( কত প্রকৃতির বা কত রূপের কিংবা কত ধরনের ) তা শুধু তিনিই জানেন ।

-★সূরা আন’আম-৬৫
قُلۡ هُوَ الۡقَادِرُ عَلٰٓى اَنۡ يَّبۡعَثَ عَلَيۡكُمۡ عَذَابًا مِّنۡ فَوۡقِكُمۡ اَوۡ مِنۡ تَحۡتِ اَرۡجُلِكُمۡ اَوۡ يَلۡبِسَكُمۡ شِيَعًا وَّيُذِيۡقَ بَعۡضَكُمۡ بَاۡسَ بَعۡضٍ‌ؕ

তুমি তাদের বলঃ যে আল্লাহ্ তোমাদের ঊর্ধ্বলোক হতে বা উপর থেকে এবং তোমাদের পায়ের নিচ হতে শাস্তি বা বিপদ পাঠাতে পূর্ণ সক্ষম ।

★সূরা আ’রাফ-৯১
فَاَخَذَتۡهُمُ الرَّجۡفَةُ فَاَصۡبَحُوۡا فِىۡ دَارِهِمۡ جٰثِمِيۡنَ‌ۛ‌ۚ

তারপর আমার ভূমিকম্প তাদেরকে গ্রাস করে ফেললো । ফলে তারা তাদের নিজেদের গৃহেই মৃত অবস্থায় উল্টো হয়ে পড়ে রইল ।

★সূরা কামার-৩৪
اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنَا عَلَيۡهِمۡ حَاصِبًا اِلَّاۤ اٰلَ لُوۡطٍ‌ؕ نَّجَّيۡنٰهُمۡ بِسَحَرٍۙ‏

তারপর আমি এই সম্প্রদায়ের ওপর প্রেরণ করেছিলাম প্রস্তর বর্ষণকারী এক প্রচন্ড ঘুর্ণিবায়ু ।

★সূরা ইউনুস-১৩
وَلَقَدۡ اَهۡلَكۡنَا الۡقُرُوۡنَ مِنۡ قَبۡلِكُمۡ لَمَّا ظَلَمُوۡا‌ۙ
অবশ্যই আমি তোমাদের পূর্বে বহু জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছি, যখন তারা সীমা অতিক্রম করেছিলো।

★সূরা সাবা-১৬-১৭
فَاَعۡرَضُوۡا فَاَرۡسَلۡنَا عَلَيۡهِمۡ سَيۡلَ الۡعَرِمِ وَبَدَّلۡنٰهُمۡ بِجَنَّتَيۡهِمۡ جَنَّتَيۡنِ ذَوَاتَىۡ اُكُلٍ خَمۡطٍ وَّاَثۡلٍ وَّشَىۡءٍ مِّنۡ سِدۡرٍ قَلِي- لٍ‏ذٰلكَ جَزَيۡنٰهُمۡ بِمَا
كَفَرُوۡاۚ وَهَلۡ نُجٰزِىۡۤ اِلَّا الۡكَفُوۡرَ‏

তারপর প্রবল বন্যার পানি তৈরি করলাম এবং ফসলি জমিগুলো পরিবর্তন করে দিলাম। অকৃতজ্ঞ অহংকারী ছাড়া এমন শাস্তি আমি কাউকে দিই না ।

★সূরা বাকারা-১৫৫
﴿ وَلَنَبۡلُوَنَّكُمۡ بِشَىۡءٍ مِّنَ الَوۡفِ وَالۡجُوۡعِ وَنَقۡصٍ مِّنَ الۡاَمۡوٰلِ وَالۡاَنۡفُسِ وَالثَّمَرٰتِؕ وَبَشِّرِ الصّٰبِرِيۡنَۙ‏﴾

আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান-মালের ক্ষতি এবং ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে পরীক্ষা করব । তবে তুমি ধৈর্যশীলদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দাও ।

★সূরা সাফফাত-১৭৩
وَإِنَّ جُندَنَا لَهُمُ الْغَالِبُونَ
আর আমার বাহিনীই বিজয়ী হবে।

★সূরা আন’আম-৪৪-৪৫
﴿فَلَمَّا نَسُوۡا مَا ذُكِّرُوۡا بِهٖ فَتَحۡنَا عَلَيۡهِمۡ اَبۡوٰبَ كُلِّ شَىۡءٍ حَتّٰٓى اِذَا فَرِحُوۡا بِمَاۤ اُوۡتُوۡۤا اَخَذۡنٰهُمۡ بَغۡتَةً فَاِذَا هُمۡ مُّبۡلِسُوۡنَ﴾﴿فَقُطِعَ
অাল্লাহর পক্ষ থেকে তাদেরকে উপদেশ এবং দিক-নির্দেশনা দেওয়া হলো, তারা তা ভুলে গেল ( আল্লাহর কথাকে তুচ্ছ ভেবে প্রত্যাখ্যান করলো ) তাদের এই সীমালংঘনের পর আমি তাদের জন্যে প্রতিটি কল্যাণকর বস্তুর দরজা খুলে দিলাম অর্থাৎ তাদের জন্যে ভোগ বিলাসিতা, খাদ্য সরঞ্জাম, প্রত্যেক সেক্টরে সফলতা, উন্নতি এবং উন্নয়ন বৃদ্ধির দরজা সমূহ খুলে দিলাম । শেষ পর্যন্ত যখন তারা আমার দানকৃত কল্যাণকর বস্তু সমূহ পাওয়ার পর আনন্দিত, উল্লাসীত এবং গর্বিত হয়ে উঠলো, তারপর হঠাৎ একদিন আমি সমস্ত কল্যাণকর বস্তুর দরজা সমূহ বা সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার দরজাসমূহ বন্ধ করে দিলাম। আর তারা সেই অবস্থায় হতাশ হয়ে পড়লো ।

তারপর এই অত্যাচারী সম্প্রদায়ের মূল শিকড় কর্তিত হয়ে গেল এবং সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্যেই র‌ইলো, যিনি বিশ্বজগতের কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালনকারী বা সবকিছুর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণকারী “রব” ।

★সূরা মূলক্-১৬-১৭
﴿ ءَاَمِنۡتُمۡ مَّنۡ فِىۡ السَّمَآءِ اَنۡ يَّخۡسِفَ بِكُمُ الۡاَرۡضَ فَاِذَا هِىَ تَمُوۡرُۙ﴾

﴿ اَمۡ اَمِنۡتُمۡ مَّنۡ فِىۡ السَّمَآءِ اَنۡ يُّرۡسِلَ عَلَيۡكُمۡ حَاصِبًا‌ؕ فَسَتَعۡلَمُوۡنَ كَيۡفَ نَذِيۡرِ﴾

১৬.) যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের মা
বিপর্যয় ও মহামারীর সময় ঘরে নামাজ আদায়ের হুকুম সংক্রান্ত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর হাদিস । বোখারী শরীফ হাদিস নং-৯০১,মুসলিম শরীফ হাদিস নং -১৪৮৯।

قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ لِمُؤَذِّنِهِ فِي يَوْمٍ مَطِيرٍ إِذَا قُلْتَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ‏.‏ فَلاَ تَقُلْ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ‏.‏ قُلْ صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ‏.‏ فَكَأَنَّ النَّاسَ اسْتَنْكَرُوا، قَالَ فَعَلَهُ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي، إِنَّ الْجُمُعَةَ عَزْمَةٌ، وَإِنِّي كَرِهْتُ أَنْ أُخْرِجَكُمْ، فَتَمْشُونَ فِي الطِّينِ وَالدَّحْضِ‏.‏

অর্থঃ- ইব্‌নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ: তিনি তাঁর মুয়ায্‌যিনকে এক প্রবল বর্ষণের দিনে বললেন, যখন তুমি (আযানে) ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লাহ্‌ বলবে, তখন ‘হাইয়া আলাস্‌ সালাহ্’ বলবে না, বলবে, “সাল্‌লু ফী বুয়ুতিকুম” (তোমরা নিজ নিজ বাসগৃহে সালাত আদায় কর)। তা লোকেরা অপছন্দ করল। তখন তিনি বললেনঃ আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তিই (রাসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ) তা করেছেন। জুমু’আ নিঃসন্দেহে জরুরী। আমি অপছন্দ করি তোমাদেরকে মাটি ও কাদার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করার অসুবিধায় ফেলতে। (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৯০১)

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَبَّاسٍ، أَنَّهُ قَالَ لِمُؤَذِّنِهِ فِي يَوْمٍ مَطِيرٍ إِذَا قُلْتَ أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ فَلاَ تَقُلْ حَىَّ عَلَى الصَّلاَةِ قُلْ صَلُّوا فِي بُيُوتِكُمْ – قَالَ – فَكَأَنَّ النَّاسَ اسْتَنْكَرُوا ذَاكَ فَقَالَ أَتَعْجَبُونَ مِنْ ذَا قَدْ فَعَلَ ذَا مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي إِنَّ الْجُمُعَةَ عَزْمَةٌ وَإِنِّي كَرِهْتُ أَنْ أُحْرِجَكُمْ فَتَمْشُوا فِي الطِّينِ وَالدَّحْضِ ‏.

অর্থঃ-‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত,এক বৃষ্টিঝরা দিনে তিনি মুয়াযযিনকে বললেনঃ আজকের আযানে যখন তুমি “আশহাদু আল্লা-ইলা-হা ইল্লাল্ল-হ, আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রসূলুল্লা-হ” বলে শেষ করবে তার পরে কিন্তু “হাইয়্যা ‘আলাস সলা-হ” বলবে না। বরং বলবে, “সল্লু ফী বুয়ূতিকুম” অর্থাৎ- তোমরা তোমাদের বাড়ীতেই সলাত আদায় করে নাও।
হাদীসের বর্ণনা কারী (‘আবদুল্লাহ ইবনু হারিস) বলেছেনঃ এরূপ করা লোকজন পছন্দ করল না বলে মনে হ’ল। তা দেখে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস বললেনঃ তোমরা এ কাজকে আজগুবি মনে করছ? অথচ যিনি আমার চেয়ে উত্তম তিনি এরূপ করেছেন। জুমু’আর সলাত আদায় করা ওয়াজিব। কিন্তু তোমরা কাদাযুক্ত পিচ্ছিল পথে কষ্ট করে চলবে তা আমি পছন্দ করিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪৮৯)
করোনা এবং জনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত সাধারণ ফিকহি নীতিমালা

ক. আল-কাওয়ায়েদ আল-ফিকহিয়া
এবং বোঝাবুঝির প্রাথমিক পরিকাঠামো:
মুসলিম ফিকাহশাস্ত্রে ‘কায়েদা ফিকহিয়া’ বলে বোঝানো হয়, “আরোহ[১] পদ্ধতিতে প্রাপ্ত একটি সাধারণ নিয়ম, যা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।” মূলত ওলামায়ে কেরাম ইস্তিকরা [২] নামক একটি পদ্ধতিতে প্রাসঙ্গিক কোরান-হাদিসের নসকে (সরাসরি বক্তব্য) সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করেন এবং আরোহ বিধি অনুযায়ী সাধারণ নীতিমালা প্রণয়ন করেন, যা একাধিক দৃশ্যকল্পের জন্য প্রযোজ্য। কোন বিশেষ আলেমের ব্যবহৃত প্রমাণাদি একটি সাধারণ সূত্র (কায়েদা কুল্লিয়া) প্রমাণে যথেষ্ঠ হতে পারে আবার নাও পারে, কিন্তু নিম্নোক্ত এই পাঁচটি কায়েদার উপর সমগ্র ফুকাহা একমত:
১. কোন কাজ তার নিয়তের উপর নির্ভরশীল,
২. নিশ্চিত জ্ঞান (ইয়াকিন) ধারণাপ্রসূত জ্ঞান (যন্ন) দ্বারা বাতিল হবেনা,
৩. কষ্টকর পরিস্থিতি সহজতার রাস্তা খুলে দিবে,
৪. উরফ (জনকল্যাণমূলক প্রথা—যা নসের বিরোধী নয়) প্রমাণ হিসেবে গ্রহনযোগ্য এবং
৫. ক্ষতিসাধন থেকে বিরত থাকা, এমনকি ক্ষতির বদলায়ও ক্ষতি আনয়ন থেকে বিরত থাকা।

এই পাঁচটি বাদেও আরো অনেক কায়েদা ফিকহের বিভিন্ন অধ্যায়ে ব্যবহার করা হয়, যেমন: ইবাদত, অর্থনৈতিক লেনদেন, তালাক-বিয়েশাদী এবং অপরাধশাস্ত্র। হাফিজ ইবনু রজব এবং আল্লামা ইবনুল লাহহাম তাঁদের কিতাবে এ নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করেছেন।
খ. করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত কাওয়ায়েদ ফিকহিয়া:
১. ﺍﻟﻀﺮﺭ ﻳﺰﺍﻝ ﺃﻭ ﻻ ﺿﺮﺭ ﻭﻻ ﺿﺮﺍﺭ
ক্ষতির উপস্থিতিকে দূর করতে হবে। অন্য কথায়, ক্ষতিসাধন করা যাবেনা এবং ক্ষতির বদলায় ক্ষতি আনা যাবেনা।
এই কায়েদার কতিপয় শাখা-কায়েদা রয়েছে:
সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ যতোটুকু সম্ভব ততোটুকু ক্ষতি বিলোপ করতে হবে,
একটি ক্ষতি দূর করতে আরেকটি ক্ষতির সাহায্য নেয়া যাবেনা,
সামাজিক ক্ষতি দূর করতে গিয়ে ব্যক্তিগত ক্ষতি সহ্য করতে হলে সেটাই করতে হবে,
ক্ষতি বিলোপ এবং উপকার আনয়ন— এ দুটোর মাঝে একটি বাছাই করতে হলে, ক্ষতি বিলোপ উপকার আনয়নের উপর প্রাধান্য পাবে।

২. ﻣﺎ ﻻ ﻳﺪﺭﻙ ﻛﻠﻪ ﻻ ﻳﺘﺮﻙ ﺟﻠﻪ ﺃﻭ ﺍﻟﻤﻴﺴﻮﺭ ﻻ ﻳﺴﻘﻂ ﺑﺎﻟﻤﻌﺴﻮﺭ
কোন একটি লক্ষ্য বা কর্ম পরিপূর্ণভাবে অর্জন বা সম্পাদন না করতে পারলেও সেটি সার্বিকভাবে বর্জন করা যাবেনা। অন্যভাবে বললে, ইবাদতের কোন অংশ সম্পাদন করা অসম্ভব হয়ে পড়লে, এর বাকি সম্পাদনযোগ্য অংশগুলো সম্পাদন করতে হবে।

৩. ﺍﻟﻤﺼﻠﺤﺔ ﺍﻟﻌﺎﻣﺔ ﻣﻘﺪﻣﺔ ﻋﻠﻰ ﺍﻟﻤﺼﻠﺤﺔ ﺍﻟﺨﺎﺻﺔ
দুটোর মাঝে একটি বাছাই করতে হলে, সামাজিক উপকার নিশ্চিতকরণ ব্যক্তিগত উপকার নিশ্চিত করার উপরে প্রাধান্য পাবে। অর্থ্যাৎ সামাজিক/সামষ্টিক কল্যাণ ব্যক্তিগত কল্যাণের উপর প্রাধান্য পাবে।
দুটো স্বতন্ত্র ক্ষতিকর জিনিসের মাঝে একটি বাছাই করার কায়েদা নিয়ে ইমাম বদরুদ্দিন যারকাশি বলেন,
“ইবনু আবদিস সালাম বলেছেন, ‘সমস্ত ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, অপেক্ষাকৃত বড় ক্ষতিটি প্রতিহত করতে হবে, যদিও এর মাধ্যমে ছোট ক্ষতিটি সম্পাদিত হয়ে যায় (অথবা ঠেকানো না যায়)।’ ইবনু দাকিক আল-ইদ বলেছেন, ‘দুটো ক্ষতির মধ্য থেকে একটি বাছাই করা ব্যাতিত অন্য কোন উপায় না থাকলে, বড় ক্ষতিটি প্রতিহত করার জন্য ছোট ক্ষতিটি সম্পন্ন হতে দিতে হবে। এটি একটি কায়েদা কুল্লিয়া (সার্বজনীন সূত্র)। এর দলিল হলো ঐ হাদিসটি, যেখানে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে প্রস্রাব করা আরব ব্যক্তিকে ধমক দিতে নিষেধ করেছেন।‘” [৩]
এখন তাহলে কীভাবে এই ইস্যুটিকে কাঠামোতে আনা যায়? কে সিদ্ধান্ত নিবে কোন ক্ষতিটি বড়? এ বিষয়টি ঠিকভাবে বুঝতে আমরা শরিয়ার উদ্দেশ্যশাস্ত্র বিশ্লেষণ করবো। ফুরুয়ি ফিকহের অধ্যায়গুলো হতে নীচে কিছু উদাহরণ দেয়া হলো:

নামায:
নাফি হতে বর্ণিত,
“ইবনু ওমর দজনানের (এক শহরের নাম) এক ঠাণ্ডা রাতে আযান দিলেন এবং বললেন, ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ (প্রত্যেকে যার যার বাসস্থানে নামায পড়ে নাও)। অতঃপর তিনি আমাদেরকে জানালেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠাণ্ডা, বৃষ্টিমুখর অথবা সফরের রাতে মুয়াজ্জিনকে ‘আলা সাল্লু ফির রিহাল’ বলতে নির্দেশ দিতেন।” [৪]
সুতরাং বোঝা গেল, ঠাণ্ডা, বৃষ্টি ও সফরের সময় মসজিদে গিয়ে জামায়েতে নামায আদায় না করা জায়েয। কারণ? আগেই কায়েদাটি আমরা উল্লেখ করেছি, “কষ্টকর পরিস্থিতি সহজতার রাস্তা খুলে দিবে।”
আল্লাহ তায়ালার এই কালাম এখানে প্রাসঙ্গিক,
“যখন আপনি তাদের মধ্যে থাকেন, অতঃপর নামাযে দাঁড়ান, তখন যেন একদল দাঁড়ায় আপনার সাথে এবং তারা যেন স্বীয় অস্ত্র সাথে নেয়। অতঃপর যখন তারা সেজদা সম্পন্ন করে, তখন আপনার কাছ থেকে যেন সরে যায় এবং অন্য দল যেন আসে, যারা নামায পড়েনি। অতঃপর তারা যেন আপনার সাথে নামায পড়ে এবং আত্মরক্ষার হাতিয়ার সাথে নেয়। কাফেররা চায় যে, তোমরা কোন রূপে অসতর্ক থাক, যাতে তারা একযোগে তোমাদেরকে আক্রমণ করে বসে। যদি বৃষ্টির কারণে তোমাদের কষ্ট হয় অথবা তোমরা অসুস্থ হও, তবে স্বীয় অস্ত্র পরিত্যাগ করায় তোমাদের কোন গোনাহ নেই; এবং সাথে নিয়ে নাও তোমাদের আত্মরক্ষার অস্ত্র। নিশ্চয় আল্লাহ কাফেরদের জন্যে অপমানকর শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন।” [৫]

রোজা:
আল্লাহ তায়ালা বলেন,
“কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে (রোজার) সংখ্যাটি পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা (রোজার) সংখ্যাটি পূরণ কর।” [৬]
অতএব আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, কেউ যদি অসুস্থ হয়, তাহলে তার জন্য রোজা ভাঙ্গা অধিকতর শ্রেয়। ইমাম শামসুদ্দিন ইবনু মুফলিহ বলেন, রোজা রাখলে যদি অসুস্থ ব্যক্তির অসুস্থতা বেড়ে যাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশংকা থাকে, সেক্ষেত্রে রোজা রাখা অথবা রোজা চালিয়ে যাওয়া মাকরুহ। এমনকি রোজা রাখার কারণে যদি মাথা ব্যাথ্যা কিংবা জ্বর বেড়ে ক্ষতির সম্ভাবনা থাকে, তাহলেও রোজা রাখা মাকরুহ। ইমাম আহমাদ (রা.) কে প্রশ্ন করা হলো, “অসুস্থ ব্যক্তি কখন রোজা ভাঙবে?”। তিনি বললেন, “যখন রোজা রাখা আর সম্ভব না।“ জিজ্ঞাসা করা হলো, “জ্বর কি (এরকম অসুস্থতার) উদাহরণ (হতে পারে)?” তিনি বললেন, “জ্বরের চেয়ে কঠিন কোন রোগ আছে?” অতএব, রোজার কারণে ক্ষতির আশংকা থাকলে রোজা রাখা মাকরুহ। অধিকন্তু ‘আর-রে’আয়াহ’ ও ‘আল-ইনতেসার’ এ এসেছে, কোন ব্যক্তি যদি জেহারের কারণে রোজা রাখে, কিন্তু সে একটি জীবনাশঙ্কাপূর্ণ রোগে ভুগছে বা আপতিত হয়েছে, তাহলে তার জন্য রোজা ভাঙ্গা ফরজ। [৭]
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিস এখানে প্রাসঙ্গিক, “সফরের সময় রোজা রাখা কোন পূন্যের কাজ নয়।” [৮]

হজ্জ:
কোরান-হাদিসের স্পষ্ট নস থেকে আমরা জানি যে, হজ্জের জন্য সক্ষমতা থাকা আবশ্যক। সুতরাং কেউ যদি অক্ষম হয়, তার জন্য হজ্জ ফরজ নয়।[৯]
কখন জামাত এবং জুমার নামাজে অংশগ্রহন না করা জায়েয?
আল-মুহাররির ইমাম মনসুর আল বুহুতি বলেন,
“জামাত ও জুমার নামায আদায় করার আবশ্যকতা হতে ওজরপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন: অসুস্থ ব্যক্তি। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন অসুস্থ হয়েছিলেন, তখন তিনি মসজিদে যাননি; বরং বলেছেন, ‘আবু বকরকে বলো লোকদের ইমামতি করতে!’ বুখারি ও মুসলিমের সহীহতে এটি বর্ণিত হয়েছে। ওজরপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন তারাও, যারা (জুমা ও জামাতে যাওয়ার কারণে) অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ভয় করেন। একিভাবে আছেন তারা, যারা প্রস্রাব-পায়খানার (প্রচন্ড) চাপে আছেন। অথবা এমন (ক্ষুধার্ত) ব্যক্তি যার সামনে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে এবং সে এই খাদ্যের মুখাপেক্ষী; সে পরিতৃপ্ত হওয়া পর্যন্ত খাবে, যেমনটি আনাস হতে বুখারি ও মুসলিমের সহিহতে বর্ণিত হয়েছে। অথবা তারা, যারা তাদের সম্পদ হারানোর ভয় করেন, সম্পদ চলে যাওয়ার ভয় করেন অথবা সম্পদের কোন ক্ষতির আশঙ্কা করেন। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যখন ভয় করে কোন চোর তার সম্পদ চুরি করে নিতে পারে। অথবা তারা, যাদের চুল্লিতে রুটি বসানো আছে এবং (জুমা ও জামাতে যাওয়ার কারণে) রুটি পুড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথবা তারা, যাদের কিছু হারিয়ে গিয়েছে এবং (জুমা ও জামাতে যাওয়ার কারণে) খুঁজে না পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথবা তারা, যারা কোন কিছু হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা করেন, যদিও তারা কোন বাগান কিংবা সম্পত্তির পাহারাদার মাত্র। অথবা তারা, যারা তাদের জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্থ হওয়ার আশঙ্কা করেন।

একিভাবে জুমা ও জামাতে যাওয়ার কারণে কোন আত্মীয় বা সফরসঙ্গী মরে যাওয়ার আশংকা থাকলে, অথবা কোন অসুস্থ ব্যক্তির সেবায় কেউ না থাকলে, অথবা কেউ তার পরিবার ও সন্তানদের ব্যাপারে কোন (ক্ষতির) ভয়ে থাকলে (তারা ওজরপ্রাপ্তদের মধ্যে গণ্য হবেন)।” [১০]
উপরের এই বিষয়গুলো মাথায় রেখে, আমরা কি বলতে পারিনা যে করোনা ভাইরাসের মতো বৈশ্বিক মহামারির এ দুর্যোগে জুমা এবং জামাতের নামাজের জন্য জমায়েত না হওয়া শুধু জায়েয নয়, বরং মুস্তাহাব? এখন পর্যন্ত ফিকহের অধ্যায় চষে আমরা দেখেছি:
হত্যার শিকার হওয়ার ভয় থাকলে নামাজের আরকান ও ওয়াজিবাত বাদ দিয়ে নামায পড়া যাবে।
জামাত ও জুমা ত্যাগ করা যাবে, যদি প্রসাব পায়খানার চাপ থাকে।
জামাত ও জুমা ত্যাগ করা যাবে, যদি সম্পদ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কা থাকে।
জামাত ও জুমা ত্যাগ করা যাবে, যদি সফরসঙ্গী কিংবা ভালোবাসার কেউ মরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
রোজা ভাঙ্গা বা না রাখা যাবে, যদি কেউ অসুস্থ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে— যদিও তারা ঐ মুহুর্তে অসুস্থ নয়।
এগুলো সব ফিকহসিদ্ধ হলে, অতিদ্রুত ক্রমপ্রসারমান একটি মরণঘাতী সংক্রামক ভাইরাস এবং তার মহামারির জন্য আমরা মসজিদে জুমা ও জামাতের জন্য জমায়েত হওয়া বন্ধ করার কথা কি আমরা বলতে পারিনা, যেখানে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের পরিবার ও সমাজের বৃদ্ধ ও বয়স্কদেরকে পরিষ্কার মৃত্যুর আশংকায় ফেলে দিচ্ছি এবং বাকি নিজেদেরকে একটি ভয়ংকর ভাইরাসের জন্য বাহক হিসেবে উপস্থাপন করছি? যুক্তি বা ফিকহ কোন বিচারেই এটি মানা যায়। অন্তত ইসলামের বক্তব্য এটি নয়।
কিয়াস নিয়ে কিছু কথা:
কিয়াস হচ্ছে কোন বিষয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মতামত অনুসরণ করে অন্য আরেকটি বিষয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত প্রতিপাদন করা। গোটা সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়ায় প্রাসঙ্গিক ইল্লত মাথায় রাখা জরুরী। নতুন সিদ্ধান্ত বা হুকুম প্রয়োগ করার জন্য যে ফিকহি কারণ (ratio legis) উল্লেখ করা হয়ে থাকে সেটাকে ইল্লত বলা হয়। [১২]

কিয়াসুল ইল্লত:
এ ধরণের কিয়াসের ক্ষেত্রে আমরা ইল্লত জানি এবং সরাসরি নস থেকে সেটি পাই। এক্ষেত্রে ইল্লতটিকে নসে বর্ণিত নয় এমন শাখাগত মাসয়ালায় প্রয়োগ করতে পারি। উদাহরণ হিসেবে নাফি বর্ণিত আগের হাদিসটি পুনরায় দেখুন।
“ইবনু ওমর দজনানের এক ঠাণ্ডা রাতে আযান দিলেন এবং বললেন, ‘সাল্লু ফি রিহালিকুম’ (প্রত্যেকে যার যার বাসস্থানে নামায পড়ে নাও)। অতঃপর তিনি আমাদেরকে জানালেন যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঠাণ্ডা, বৃষ্টিমুখর অথবা সফরের রাতে মুয়াজ্জিনকে ‘আলা সাল্লু ফির রিহাল’ বলতে নির্দেশ দিতেন।”
এই হাদিসটিকে মূল মাসয়ালা (আসল) বলা হয়, অর্থাৎ সেই নস যেটি হুকুম নির্দেশ করে।
বর্তমান কেইসটির ক্ষেত্রে, জুমা বা জামাতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভাইরাসবাহী হওয়া এবং নিজেসহ বাকি মানুষদেরকে (বিশেষ করে বাসার বয়স্কদেরকে) মহামারির শিকার হওয়ার প্রমাণিত সম্ভাবনায় ফেলে দেয়া। এই মাসয়ালাটিকে আমরা শাখা মাসয়ালা (ফার’) হিসেবে নেয়া হচ্ছে।
দুই মাসয়ালার মাঝে এক্ষেত্রে কমন হলো ক্ষতির আশঙ্কা (ইল্লত)।
অতএব কিয়াসকৃত হুকুম হচ্ছে, পারস্পরিক দূরত্ব বজায় না রাখার জন্য কিংবা নামাজের জন্য জমায়েত হওয়ার জন্য যদি কেউ নিজের কিংবা অন্যের ক্ষতির আশঙ্কা করে, তাহলে সে অবশ্যই জুমা কিংবা জামাতে যাওয়া হতে বিরত থাকবে।
ঐতিহাসিক উদাহরণ:
আগে কি কখনো মসজিদ বন্ধ হয়েছে?

আমরা নাফির হাদিস হতে দেখেছি যে, আমাদের হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে ঘরে নামায পড়তে বলেছিলেন যেখানে তাদের আসবাবপত্র আছে। এর অর্থ হচ্ছে, তখন মসজিদে কেউ নামায পড়ছিলোনা। হাদিস থেকে এটি স্পষ্ট।
ইমাম যাহাবি, ইবনুল আসির এবং ইবনুল জাওযি ১০৫৬ ঈসায়ী সনের একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন, যখন প্রচন্ড খরার কারণে অনেক মানুষ মারা যায়। মৃতের সংখ্যা এতো হয়ে যায় যে তাদের কবর দেয়ার জায়গা পাওয়া যায়নি; যার ফলে একটি মহামারি রোগ ছড়িয়ে পড়ে মিশর, আন্দালুস (বর্তমান স্পেন) এবং ইরাকে। ফলশ্রুতিতে সেখানকার মসজিদগুলো বন্ধ হয়ে যায় এবং ইরাক থেকে হজ্জ কাফেলা বন্ধ হয়ে যায়। এই মহামারির ফলে দ্রব্যমূল্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। গোসল ব্যাতিত মৃতদের দাফন করা হয়, বাতাস বিষাক্ত হয়ে যায় (বায়ুবাহিত বলে ধারণা করা যায়), মাছির আনাগোনা বেড়ে যায়। মিশরে প্রতিদিন গড়ে এক হাজার মানুষ মারা যায়, যার ফলে সুলতান নিজের পকেট থেকে আঠারো হাজার মানুষের দাফন খরচ দিতে বাধ্য হন। তাছাড়াও আন্দালুসে মসজিদগুলো গণভাবে বন্ধ হয়ে যায়। [১৩]

মানুষের জীবনের মূল্য:
ইমাম আত তাহের ইবন আশুর বলেন,
“‘জীবন সংরক্ষণ’ কথার অর্থ হচ্ছে, ব্যক্তি ও সমাজ হিসেবে মানুষকে মৃত্যু থেকে হেফাযত করা। এই দুনিয়া স্বতন্ত্র পৃথক মানুষের সমাবেশ। প্রত্যেক ব্যক্তির তার নিজস্ব স্বতন্ত্র কর্ম ও গুণাবলী রয়েছে, যার প্রত্যেকটি এই দুনিয়ায় কোন না কোন ভূমিকা পালন করে থাকে। ‘জীবন সংরক্ষণের’ মূল মর্ম কিসাসের মাধ্যমে আসেনা, যেমনটি অনেক ফুকাহা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। বরং আমরা দেখি যে, কিসাস হচ্ছে রুহকে হেফাযতের সবচেয়ে দুর্বলতম উদাহরণ; কারণ এটি পূর্ববর্তী কোন ঘাটতির সংশোধনী মাত্র। ‘জীবন সংরক্ষণের’ অর্থই হচ্ছে এটি হারানোর পূর্বে একে হেফাযত করা, যেমন সংক্রামক রোগ হতে একে রক্ষা করার মাধ্যমে। ওমর ইবনুল খাত্তাব তাঁর সেনাবাহিনীকে দামেস্কে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছিলেন ‘আমওয়াস’ নামক প্লেগ বা মহামারি হতে রক্ষা করার জন্য।
আর ‘জীবন সমষ্টি’ কথাটির অর্থ হচ্ছে, ইসলামি শরিয়া কর্তৃক সম্মানিত এবং সুরক্ষিত ‘জীবনের সমষ্টি’, যারা ‘সুরক্ষিত রক্তের’ অধিকারী। আপনি কি দেখেন না যে যেনাকারীকে রজমের মাধ্যমে হত্যা করা হয়, যদিও জীবনের সুরক্ষা বংশপরম্পরার সুরক্ষা হতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
জীবনের সুরক্ষার ধারণার সাথে জীবন্ত দেহের অঙ্গগুলো ধ্বংস হতে রক্ষা করা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি অঙ্গ হারানোর অর্থ হচ্ছে (সেটির) রুহ চলে যাওয়া; কারণ দেহের ঐ অঙ্গটি আর উপকারী থাকবেনা মানুষের জন্য। এ বিষয়ে একটি উপযুক্ত উদাহরণ হলো, অনিচ্ছাকৃতভাবে দেহের কোন অঙ্গ আহত কিংবা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ দিয়ত (blood money) দেয়ার বিধান। [১৪]” [১৫]

পরিশিষ্ট:
আমাদের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষিতে মূল সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষজনের মাঝে করোনা ভাইরাস এবং মহামারী সম্পর্কে কোন/বিশদ ধারণা না থাকাটা। [নোটের নিচে (লিংক শিরোনামে দেয়া) কিছু প্রবন্ধ/সংবাদ সংযুক্ত করা হলো, যা আমাদেরকে এ মহামারীর আসল অবস্থা জানতে সাহায্য করবে এবং এ বিষয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।]
বর্তমান সময়ে মুফতিদের উচিত হবে, জনস্বাস্থ্য এবং মহামারিবিদ্যার উপযুক্ত শাস্ত্রে পরিচিত হয়ে তাদের বক্তব্যগুলো সাজানো। জনসাধারণের পক্ষ থেকে কোন আবেগী বক্তব্য আসবে, এই ভেবে মসজিদে জুমা ও জামাত চালিয়ে যাওয়া দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। শুধু মসজিদ নয়, সকল গণ জমায়েত বর্জন করার মাধ্যমে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের ঘোষণাকৃত পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ আমলে নিয়ে ফতোয়া দেয়া উচিত। সেই সাথে চিকিৎসক এবং মহামারীবিদদের সাথে সমন্বিতভাবে একটি ঘোষনা আসা উচিত, যাতে সাধারণ মানুষ ইসলামের আকিদা ও ফিকহের সাথে সামঞ্জস্যহীন কোন সিদ্ধান্ত না নেয় এবং এই ভাইরাস ছড়াতে সাহায্য না করে।

রেফারেন্স:
[১] যুক্তিশাস্ত্র অনুযায়ী আরোহ পদ্ধতি (Induction) হলো কতোগুলো সরল সত্যের মাধ্যমে একটি সাধারণ সত্য বা চূড়ান্ত সত্যে উপনীত হওয়া। আরো জানতে পড়ুন: Smith, P. (2013). An Introduction to Formal Logic. Cambridge, United Kingdom: Cambridge University Press.
[২] মাওলানা আব্দুল্লাহ গাঙ্গুহী উল্লেখ করেন, “কোন ﻛﻠﻲ এর ﺟﺰﺋﻴﺎﺕ এর মধ্যে অনুসন্ধান করে প্রায় প্রতিটি ﺟﺰﺋﻲ এর মধ্যে কোন বিশেষ গুনের সন্ধান পাওয়ার পর
গুনের সন্ধান পাওয়ার পর ﻛﻠﻲ এর সকল ﺍﻓﺮﺍﺩ এর উপর উক্ত বিশেষ গুণের হুকুম সাব্যস্ত করাকে ﺍﺳﺘﻘﺮﺍﺀ বলে। (সহজ তাইসিরুল মানতিক, হাফেজ মাওলানা মুহাঃ আব্দুল্লাহ গাঙ্গুহী, আশরাফিয়া বুক হাউজ, ২০১২)
[৩] বদরুদ্দিন যারকাশি, আল-মানসুর ফিল কাওয়ায়েদ, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ২১১-২১২, ২০০০ ঈসায়ী, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত।
[৪] যাইনুদ্দিন ইবনু রজব, ফতহুল বারি, কিতাবুল আজান, বাবুল আজান লিল মুসাফিরিন ইজা কানু জামায়াতান, ১৯৯৬ ঈসায়ী, মাক্তাবাতুল গুরাবা, মদিনা।

[৫] কোরান শরিফ, সুরা আন নিসা, আয়াত ১০২
[৬] কোরান শরিফ, সুরা আল বাকারা, আয়াত ১৮৫
[৭] শামসুদ্দিন ইবনু মুফলিহ, কিতাবুল ফুরু, চতুর্থ খন্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৫, ৪৩৭, ২০০৩ ঈসায়ী, দারুল মুয়াইয়িদ।
[৮] মুহাম্মাদ আল বুখারি, আল-জামি, কিতাবুস সওম, বাবু কওলিন নাবিয়্যি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামা লিমান জুল্লিলা আলাইহি ওয়াশতাদ্দাল হাররু, ২০০১ ঈসায়ী, দারু তওকিন নাজাত।

[৯] মনসুর আল বুহুতি, শরহ মুন্তাহা আল ইরাদাত, দ্বিতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ৪২২-৪৩৪, প্রথম সংস্করণ, ২০০০ ঈসায়ী, মুয়াসসাসাতুর রিসালা।
[১০] আব্দুল্লাহ আনকারি, হাশিয়াতুল আনকারি আলার রওদুল মুরবি, প্রথম খন্ড, পৃষ্ঠা ২৬৫-২৬৬, প্রথম সংস্করণ, ২০০৮, দারুত তা’সিল, মিশর।
[১১] যে মাসয়ালার উপর ভিত্তি করে আপনি কিয়াস করবেন সেটাকে মাকিস আলাইহি বলা হয় যার জন্য সুস্পষ্ট দলিল রয়েছে। যেই মাসয়ালার ক্ষেত্রে কিয়াস করে হুকুম প্রদান করবেন সেটাকে মাকিস বা কিয়াসকৃত মাসয়ালা বলা হয়ে থাকে; এই মাসয়ালার ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট কোনো দলিল নেই তাই একে সুস্পষ্ট দলিল নির্ভর মাসয়ালার উপর কিয়াস করা হয়ে থাকে। ইল্লত হচ্ছে যে কারণে আপনি মাকিস আলাইহির হুকুমকে এ মাসয়ালার উপর প্রয়োগ করবেন। দুটি মাসয়ালার মধ্যকার সমন্বয় ও সাদৃশ্যতার কারণেই মূলত এই হুকুম দেয়া হয়ে থাকে আর সেই হুকুম নির্ভর করে ইল্লতের উপর। যেকোন উসুলের কিতাবে এই মৌলিক কথাগুলো পাওয়া যাবে। কেউ বিস্তারিত জানতে চাইলে পড়ুন: আত তাহবির শরহুত তাহরির, আল্লামা আলাউদ্দিন মারদাবি।
[১২] আয যাহাবি, তারিখুল ইসলাম, নবম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৬১৫, তাহকিক: বাশার আল আওয়াদ। ইবনুল জাওযি, আল মুন্তাজাম, ষোড়শ অধ্যায়, পৃষ্ঠা ৫, দারুল কুতুব আল ইলমিয়া। ইবনুল আসির, আল কামিল ফিত তারিখ, অষ্টম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৪৪-১৪৫, দারুল কুতুব আরাবি।
[১৩] দিয়ত ঐ জরিমানাকে বলা হয় যা সাধারণত অনিচ্ছাকৃত হত্যা ইত্যাদি ক্ষতিসাধনের জন্য ধার্য্য করা হয়। দেখুন, কাশশাফুল কিনা, মনসুর আল বুহুতি।
[১৪] আত তাহের ইবন আশুর, মাকাসিদুশ শারিয়া আল ইসলামিয়া, তৃতীয় খন্ড, পৃষ্ঠা ২৩৬-২৩৭, ২০০৪ ঈসায়ী, আওকাফ মন্ত্রনালয়।

মোঃ ফজলুল করিম
লেখক ও গবেষক

Print Friendly, PDF & Email

দয়া করে নিউজটি শেয়ার করুন...

সংবাদ খুজুন

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস

বাংলাদেশে

আক্রান্ত
৫২,৪৪৫
সুস্থ
১১,১২০
মৃত্যু
৭০৯

বিশ্বে

আক্রান্ত
৬,৪৫২,৭০৩
সুস্থ
৩,০৬৭,৬৮১
মৃত্যু
৩৮২,৪৮৪
ঢাকা, বাংলাদেশ।
বুধবার, ৩ জুন, ২০২০
ওয়াক্তসময়
সুবহে সাদিকভোর ৩:৪৪
সূর্যোদয়ভোর ৫:১১
যোহরদুপুর ১১:৫৭
আছরবিকাল ৪:৩৬
মাগরিবসন্ধ্যা ৬:৪২
এশা রাত ৮:০৯

ফেসবুক গ্রুপে যোগ দিনঃ

 
সেরা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম – SeraNews24.Com ☑️
পাবলিক গোষ্ঠী · 23,009 জন সদস্য

গোষ্ঠীতে যোগ দিন

প্রতিমুহূর্তের সংবাদ পেতে Like দিন অফিশিয়াল পেইজ এ।
নিউজ পোর্টাল: www.SeraNews24.Com
ফেসবুক গ্রুপ: http://bit.do/SN24FBGroup
ইউটিউব চ্যানেল: http://bi…
 

 About Us     Contact     Privacy & Policy     DMCA     Sitemap

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত | সেরা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম ২০১৮

Design & Developed By Digital Computer Center
error: Content is protected !!